পৃষ্ঠাসমূহ

সোমবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৩

কুরআন ও হাদীসের সমম্বয়ে পবিত্র মাহে রমজান


  • সকল সংখ্যা
  • বিভাগ
  • লেখকবৃন্দ
  • আপনার জিজ্ঞাসা
  • পরিচ রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। ঈমাননামায  যাকাতের পরই রোযার স্থান। রোযার আরবি শব্দ সওমযার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সওম বলা হয়-প্রত্যেক সজ্ঞানবালেগ মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহারস্ত্রী সহবাস  রোযাভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং রমযান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থমুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমযান রোযা রাখা ফরয।  সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

(তরজমাহে ঈমানদারগণতোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছেযেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরযেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।-সূরা বাকারা () : ১৮৩

অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন-

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

(তরজমাসুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই  মাস পাবেসে যেন অবশ্যই রোযা রাখে।সূরা বাকারা () : ১৮৫

হযরত আবু হুরায়রা রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إذا رأيتم الهلال فصوموا وإذا رأيتموه فافطروا، فإن غم عليكم فصوموا ثلاثين،

وفي رواية : صوموا لرؤيته وأفطروا لرويته، فإن عم عليكم فاكملوا العدد.

যখন তোমরা (রমযানেরচাঁদ দেখবেতখন থেকে রোযা রাখবে আর যখন (শাওয়ালেরচাঁদ দেখবেতখন থেকে রোযা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে ত্রিশ দিন রোযা রাখবে।-সহীহ বুখারীহাদীস : ১৯০৯সহীহ মুসলিমহাদীস : ১০৮০ (১৭-১৮)

উল্লেখিত আয়াত  হাদীস এবং  বিষয়ক অন্যান্য দলীলের আলোকে প্রমাণিত যেরমযান মাসের রোযা রাখা ফরযইসলামের আবশ্যক বিধানরূপে রোযা পালন করা  বিশ্বাস করাও ফরয।

তাছাড়া কোনো শরয়ী ওযর ছাড়া কোন মুসলমান যদি রমযান মাসের একটি রোযাও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে তাহলে সে বড় পাপী  জঘন্য অপরাধীরূপে গণ্য হবে। দ্বীনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারী  ঈমান-ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। হাদীস শরীফে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ত্যাগকারী  ভঙ্গকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।

হযরত আবু উমামা রাবলেনআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

بينما أنا نائم أتاني رجلان فأخذا بضبعي فأتيابي جبلا وعرا فقالا : اصعد؛ فقلت : إني لا أطيقه. فقالا: سنسهله لك، فصعدت حتى إذا كنت في سواء الجبل إذا بأصوات شديدة، قلت : ما هذه الأصوات؟ قالوا هذا عواء أهل النار، ثم انطلق بي، فإذا أنا بقوم معلقين بعراقيبهم، مشققة اشداقهم، تسيل اشداقهم دما. قال : قلت : من هؤلاء : قال : الذين يفطرون قبل تحلة صومهم.

رواه الحاكم فى المستدرك وقال : صحيح على شرط مسلم، ووافقه الذهبي، وذكره الهيثمى فى المجمع (240)، وقال : رجاله رجال الصحيح

আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার নিকট দুই ব্যক্তি আগমন করল। তারা আমার বাহুদ্বয় ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে এল। তারপর আমাকে বললআপনি পাহাড়ের উপর উঠুন। আমি বললামআমি তো উঠতে পারব না। তারা বললআমরা আপনাকে সহজ করে দিব। আমি উপরে উঠলাম। যখন পাহাড়ের সমতলে পৌঁছালামহঠাৎ ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম সব কিসের আওয়াজতারা বললএটা জাহান্নামীদের আর্তনাদ। তারপর তারা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ কিছু লোক দেখতে পেলামযাদেরকে তাদের পায়ের মাংসপেশী দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এবং তাদের মুখের দুই প্রান্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছে এবং তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি বললামএরা কারাতারা বললযারা ইফতারের সময় হওয়ার আগেই রোযা ভেঙ্গে ফেলে।-সহীহ ইবনে খুযাইমাহাদীস : ১৯৮৬সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৭৪৪৮সুনানে নাসায়ী কুবরাহাদীস : ৩২৮৬মুসতাদরাকে হাকিমহাদীস-১৬০৯তবারানীহাদীস : ৭৬৬৬

রমযান মাসের একদিন রোযা না রাখলে মানুষ শুধু গুনাহগারই হয় না রোযার পরিবর্তে আজীবন রোযা রাখলেও রমযানের এক রোযার যে মর্যাদা  কল্যাণযে অনন্ত রহমত  খায়ের-বরকত তা কখনো লাভ করতে পারবে না এবং কোনোভাবেই এর যথার্থ ক্ষতিপূরণ আদায় হবে না।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাবলেন,

من افطر يوما من رمضان متعمدا من غير سفر ولا مرض لم يقضه ابدا، وان صام الدهر كله، ... وقد ذكره البخاري تعليقا بصيغة الجزم حيث قال : وبه قال ابن مسعود، وقال الشيخ محمد عوامه : وهذا الحديث موقوف لفظا ومرفوع حكما

যে ব্যক্তি অসুস্থতা  সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের একটি রোযাও ভঙ্গ করেসে আজীবন রোযা রাখলেও  রোযার হক আদায় হবে না।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৯৮৯৩মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকহাদীস : ৭৪৭৬সহীহ বুখারী /১৬০

হযরত আলী রাবলেন-

من افطر يوما من رضمان متعمدا لم يقضه أبدا طول الدهر.

যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমযান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করবেসে আজীবন সেই রোযার (ক্ষতিপূরণআদায় করতে পারবে না।মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৯৮৭৮

হাদীস শরীফে বর্ণিত রোযার কিছু ফযীলত  বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হলো :

রোযার প্রতিদান আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজেই দিবেন এবং বিনা হিসাবে দিবেন

প্রত্যেক নেক আমলের নির্ধারিত সওয়াব  প্রতিদান রয়েছেযার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমলকারীকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু রোযার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ রোযার বিষয়ে আছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এক অনন্য ঘোষণা।

হযরত আবু হুরায়রা রাথেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

كل عمل ابن آدم يضاعف الحسنة بعشر أمثالها إلى سبعمائة ضعف، قال الله تعالى : الا الصوم فإنه لى وانا أجزى به يدع شهوته وطعامه من أجلى.

মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকীর সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনকিন্তু রোযা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।-সহীহ মুসলিমহাদীস : ১১৫১ (১৬৪); মুসনাদে আহমদহাদীস : ৯৭১৪মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৮৯৮৭সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস : ১৬৩৮

অন্য বর্ণনায় আছে-

عن أبى هريرة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : قال الله : يترك طعامه وشرابه وشهوته من أجلى، الصيام لى وانا اجزى به، والحسنة بعشر امثالها.

হযরত আবু হুরায়রা রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনআল্লাহ রাববুল আলামীন বলেনবান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার  কামাচার বর্জন করেরোযা আমার জন্যইআমি নিজেই তার পুরস্কার দিব আর (অন্যান্যনেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ।-সহীহ বুখারীহাদীস : ১৮৯৪মুসনাদে আহমদহাদীস : ৯৯৯৯মুয়াত্তা মালেক /৩১০

রোযা বিষয়ে-অন্য বর্ণনায়-আললাহ তাআলা বলেন, ‘‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্যপক্ষান্তরে রোযা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। (সহীহ বুখারী হাদীস-১৯০৪)

 কথার তাৎপর্য হলযদিও প্রকৃতপক্ষে সকল ইবাদতই আল্লাহর জন্যতার সন্তুষ্টি  নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। তবুও রোযা  অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। তা হল-অন্যান্য সকল ইবাদতের কাঠামোগত ক্রিয়াকলাপআকার-আকৃতি  নিয়ম পদ্ধতি এমন যেতাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়াও ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ বিদ্যমান থাকে। মুখে প্রকাশ না করলেও অনেক সময় তার অন্তরে রিয়া তথা লোক দেখানো ভাব সৃষ্টি হতে পারে। তার অনুভূতির অন্তরালে  ধরনের ভাব লুকিয়ে থাকে। তা সে অনুভব করতে না পারলেও তার ভিতরে অবচেতনভাবে বিদ্যমান থাকে। ফলে সেখানে নফসের প্রভাব এসে যায়। পক্ষান্তরে রোযা এমন এক পদ্ধতিগত ইবাদততার-আকার-আকৃতি এরূপ যেআল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। রোযাদার ব্যক্তি নিজ মুখে রোযার বিষয়টি প্রকাশ না করলে সাধারণত তা আলেমুল গায়েব আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কারো নিকট প্রকাশিত হওয়ার মত নয়। তাই রোযার ক্ষেত্রে মাওলার সন্তুষ্টির বিষয়টি একনিষ্ঠভাবে প্রতিভাত হয়। একারণেই রোযা  অন্যান্য ইবাদতের মাঝে এরূপ বিস্তর ব্যবধান।

রোযার এত বড় ফযীলতের কারণ এটাও হতে পারে যেরোযা ধৈর্য্যের ফলস্বরূপ। আর ধৈর্য্যধারণকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার সুসংবাদ হল-

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

ধৈর্য্যধারণকারীগণই অগণিত সওয়াবের অধিকারী হবে।-সূরা যুমার (৩৯) : ১০

সব মাখলুকের স্রষ্টাবিশ্বজাহানের প্রতিপালকআল্লাহ তাআলা নিজেই যখন এর পুরস্কার দিবেনতখন কী পরিমাণ দিবেনইমাম আওযায়ী রাহ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেনআল্লাহ যে রোযাদারকে প্রতিদান দিবেনতা মাপা হবে নাওজন করা হবে না অর্থাৎ বিনা হিসাবেই দিবেন।

আল্লাহ তাআলা রোযাদারকে কেয়ামতের দিন পানি পান করাবেন

হযরত আবু মুসা রাহতে বর্ণিত,

ان الله تبارك وتعالى قضى على نفسه أنه من اعطش نفسه له في صائف سقاه يوم العطش،

رواه البزار، وذكره الهيثمي في المجمع (5095)، وقال : رواه البزار، ورجاله موثقون. وقال المنذري في الترغيب (1478)، : إسناده حسن، ان شاء الله.

আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজের উপর অবধারিত করে নিয়েছেনযে ব্যক্তি তার সন্তুষ্টির জণ্য গ্রীষ্মকালে (রোযার কারণেপিপাসার্ত থেকেছেতিনি তাকে তৃষ্ণার দিন (কিয়ামতের দিনপানি পান করাবেন।-মুসনাদে বাযযারহাদীস : ১০৩৯মাজমাউয যাওয়াইদহাদীস : ৫০৯৫

হযরত আবু হুরায়রা রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

قال الله تعالى : الصيام لى وانا اجزى به ... فان لهم يوم القيامة حوضا ما يرده غير الصائم،

رواه البزار وذكره الهيثمي في المجمع، (5093)، وقال : رواه البزار، ورجاله موثقون.

আল্লাহ তাআলা বলেনরোযা আমার জন্যআমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। কেয়ামতের দিন রোযাদারদের জন্য একটি বিশেষ পানির হাউজ থাকবেযেখানে রোযাদার ব্যতীত অন্য কারো আগমন ঘটবে না।-মুসনাদে বাযযারহাদীস : ৮১১৫;  মাজমাউয যাওয়াইদহাদীস : ৫০৯৩

রোযা হল জান্নাত লাভের পথ

عن حذيفة رضي الله عنه  قال : اسندت النبي صلى الله عليه وسلم إلى صدري، فقال : من قال : لا إله إلا الله ختم له بها دخل الجنة، ومن صام يوما ابتغاء وجه الله ختم له به، دخل الجنة، ومن تصدق بصدقة ختم له بها، دخل الجنة، رواه احمد، وذكره الهيثمى فى المجمع (11935) وقال : رواه احمد ورجاله رجال الصحيح غير عثمان بن مسلم البتى وهو ثقة، فالحديث صحيح كما قاله الشيخ احمد شاكر والشيخ شعيب الارنؤوط.

হযরত হুযায়ফা রাবলেনআমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার বুকের সাথে মিলিয়ে নিলামতারপর তিনি বললেনযে ব্যক্তি লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেযে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় একদিন রোযা রাখবেপরে তার মৃত্যু হয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো দান-সদকা করে তারপর তার মৃত্যু হয়সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ২৩৩২৪মুসনাদে বাযযারহা.২৮৫৪

عن أبي أمامة قال : أتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم، فقلت : مرني بعمل يدخلني الجنة، قال : عليك بالصوم، فانه لا عدل له، ثم أتيته الثانية، فقال لي : عليك بالصيام


শাবান-রমযান-১৪৩৩   ||   জুলাই-আগস্ট-২০১২

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে রোযার গুরুত্ব ও ফযীলত

মাওলানা মুহাম্মদ আনসারুল্লাহ হাসান

রমযনের রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। ঈমাননামায  যাকাতের পরই রোযার স্থান। রোযার আরবি শব্দ সওমযার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সওম বলা হয়-প্রত্যেক সজ্ঞানবালেগ মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহারস্ত্রী সহবাস  রোযাভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং রমযান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থমুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমযান রোযা রাখা ফরয।  সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

(তরজমাহে ঈমানদারগণতোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছেযেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরযেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।-সূরা বাকারা () : ১৮৩

অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন-

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

(তরজমাসুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই  মাস পাবেসে যেন অবশ্যই রোযা রাখে।সূরা বাকারা () : ১৮৫

হযরত আবু হুরায়রা রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إذا رأيتم الهلال فصوموا وإذا رأيتموه فافطروا، فإن غم عليكم فصوموا ثلاثين،

وفي رواية : صوموا لرؤيته وأفطروا لرويته، فإن عم عليكم فاكملوا العدد.

যখন তোমরা (রমযানেরচাঁদ দেখবেতখন থেকে রোযা রাখবে আর যখন (শাওয়ালেরচাঁদ দেখবেতখন থেকে রোযা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে ত্রিশ দিন রোযা রাখবে।-সহীহ বুখারীহাদীস : ১৯০৯সহীহ মুসলিমহাদীস : ১০৮০ (১৭-১৮)

উল্লেখিত আয়াত  হাদীস এবং  বিষয়ক অন্যান্য দলীলের আলোকে প্রমাণিত যেরমযান মাসের রোযা রাখা ফরযইসলামের আবশ্যক বিধানরূপে রোযা পালন করা  বিশ্বাস করাও ফরয।

তাছাড়া কোনো শরয়ী ওযর ছাড়া কোন মুসলমান যদি রমযান মাসের একটি রোযাও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে তাহলে সে বড় পাপী  জঘন্য অপরাধীরূপে গণ্য হবে। দ্বীনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারী  ঈমান-ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। হাদীস শরীফে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ত্যাগকারী  ভঙ্গকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।

হযরত আবু উমামা রাবলেনআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

بينما أنا نائم أتاني رجلان فأخذا بضبعي فأتيابي جبلا وعرا فقالا : اصعد؛ فقلت : إني لا أطيقه. فقالا: سنسهله لك، فصعدت حتى إذا كنت في سواء الجبل إذا بأصوات شديدة، قلت : ما هذه الأصوات؟ قالوا هذا عواء أهل النار، ثم انطلق بي، فإذا أنا بقوم معلقين بعراقيبهم، مشققة اشداقهم، تسيل اشداقهم دما. قال : قلت : من هؤلاء : قال : الذين يفطرون قبل تحلة صومهم.

رواه الحاكم فى المستدرك وقال : صحيح على شرط مسلم، ووافقه الذهبي، وذكره الهيثمى فى المجمع (240)، وقال : رجاله رجال الصحيح

আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার নিকট দুই ব্যক্তি আগমন করল। তারা আমার বাহুদ্বয় ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে এল। তারপর আমাকে বললআপনি পাহাড়ের উপর উঠুন। আমি বললামআমি তো উঠতে পারব না। তারা বললআমরা আপনাকে সহজ করে দিব। আমি উপরে উঠলাম। যখন পাহাড়ের সমতলে পৌঁছালামহঠাৎ ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম সব কিসের আওয়াজতারা বললএটা জাহান্নামীদের আর্তনাদ। তারপর তারা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ কিছু লোক দেখতে পেলামযাদেরকে তাদের পায়ের মাংসপেশী দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এবং তাদের মুখের দুই প্রান্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছে এবং তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি বললামএরা কারাতারা বললযারা ইফতারের সময় হওয়ার আগেই রোযা ভেঙ্গে ফেলে।-সহীহ ইবনে খুযাইমাহাদীস : ১৯৮৬সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৭৪৪৮সুনানে নাসায়ী কুবরাহাদীস : ৩২৮৬মুসতাদরাকে হাকিমহাদীস-১৬০৯তবারানীহাদীস : ৭৬৬৬

রমযান মাসের একদিন রোযা না রাখলে মানুষ শুধু গুনাহগারই হয় না রোযার পরিবর্তে আজীবন রোযা রাখলেও রমযানের এক রোযার যে মর্যাদা  কল্যাণযে অনন্ত রহমত  খায়ের-বরকত তা কখনো লাভ করতে পারবে না এবং কোনোভাবেই এর যথার্থ ক্ষতিপূরণ আদায় হবে না।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাবলেন,

من افطر يوما من رمضان متعمدا من غير سفر ولا مرض لم يقضه ابدا، وان صام الدهر كله، ... وقد ذكره البخاري تعليقا بصيغة الجزم حيث قال : وبه قال ابن مسعود، وقال الشيخ محمد عوامه : وهذا الحديث موقوف لفظا ومرفوع حكما

যে ব্যক্তি অসুস্থতা  সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের একটি রোযাও ভঙ্গ করেসে আজীবন রোযা রাখলেও  রোযার হক আদায় হবে না।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৯৮৯৩মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকহাদীস : ৭৪৭৬সহীহ বুখারী /১৬০

হযরত আলী রাবলেন-

من افطر يوما من رضمان متعمدا لم يقضه أبدا طول الدهر.

যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমযান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করবেসে আজীবন সেই রোযার (ক্ষতিপূরণআদায় করতে পারবে না।মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৯৮৭৮

হাদীস শরীফে বর্ণিত রোযার কিছু ফযীলত  বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হলো :

রোযার প্রতিদান আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজেই দিবেন এবং বিনা হিসাবে দিবেন

প্রত্যেক নেক আমলের নির্ধারিত সওয়াব  প্রতিদান রয়েছেযার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমলকারীকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু রোযার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ রোযার বিষয়ে আছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এক অনন্য ঘোষণা।

হযরত আবু হুরায়রা রাথেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

كل عمل ابن آدم يضاعف الحسنة بعشر أمثالها إلى سبعمائة ضعف، قال الله تعالى : الا الصوم فإنه لى وانا أجزى به يدع شهوته وطعامه من أجلى.

মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকীর সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনকিন্তু রোযা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।-সহীহ মুসলিমহাদীস : ১১৫১ (১৬৪); মুসনাদে আহমদহাদীস : ৯৭১৪মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৮৯৮৭সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস : ১৬৩৮

অন্য বর্ণনায় আছে-

عن أبى هريرة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : قال الله : يترك طعامه وشرابه وشهوته من أجلى، الصيام لى وانا اجزى به، والحسنة بعشر امثالها.

হযরত আবু হুরায়রা রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনআল্লাহ রাববুল আলামীন বলেনবান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার  কামাচার বর্জন করেরোযা আমার জন্যইআমি নিজেই তার পুরস্কার দিব আর (অন্যান্যনেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ।-সহীহ বুখারীহাদীস : ১৮৯৪মুসনাদে আহমদহাদীস : ৯৯৯৯মুয়াত্তা মালেক /৩১০

রোযা বিষয়ে-অন্য বর্ণনায়-আললাহ তাআলা বলেন, ‘‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্যপক্ষান্তরে রোযা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। (সহীহ বুখারী হাদীস-১৯০৪)

 কথার তাৎপর্য হলযদিও প্রকৃতপক্ষে সকল ইবাদতই আল্লাহর জন্যতার সন্তুষ্টি  নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। তবুও রোযা  অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। তা হল-অন্যান্য সকল ইবাদতের কাঠামোগত ক্রিয়াকলাপআকার-আকৃতি  নিয়ম পদ্ধতি এমন যেতাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়াও ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ বিদ্যমান থাকে। মুখে প্রকাশ না করলেও অনেক সময় তার অন্তরে রিয়া তথা লোক দেখানো ভাব সৃষ্টি হতে পারে। তার অনুভূতির অন্তরালে  ধরনের ভাব লুকিয়ে থাকে। তা সে অনুভব করতে না পারলেও তার ভিতরে অবচেতনভাবে বিদ্যমান থাকে। ফলে সেখানে নফসের প্রভাব এসে যায়। পক্ষান্তরে রোযা এমন এক পদ্ধতিগত ইবাদততার-আকার-আকৃতি এরূপ যেআল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। রোযাদার ব্যক্তি নিজ মুখে রোযার বিষয়টি প্রকাশ না করলে সাধারণত তা আলেমুল গায়েব আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কারো নিকট প্রকাশিত হওয়ার মত নয়। তাই রোযার ক্ষেত্রে মাওলার সন্তুষ্টির বিষয়টি একনিষ্ঠভাবে প্রতিভাত হয়। একারণেই রোযা  অন্যান্য ইবাদতের মাঝে এরূপ বিস্তর ব্যবধান।

রোযার এত বড় ফযীলতের কারণ এটাও হতে পারে যেরোযা ধৈর্য্যের ফলস্বরূপ। আর ধৈর্য্যধারণকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার সুসংবাদ হল-

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

ধৈর্য্যধারণকারীগণই অগণিত সওয়াবের অধিকারী হবে।-সূরা যুমার (৩৯) : ১০

সব মাখলুকের স্রষ্টাবিশ্বজাহানের প্রতিপালকআল্লাহ তাআলা নিজেই যখন এর পুরস্কার দিবেনতখন কী পরিমাণ দিবেনইমাম আওযায়ী রাহ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেনআল্লাহ যে রোযাদারকে প্রতিদান দিবেনতা মাপা হবে নাওজন করা হবে না অর্থাৎ বিনা হিসাবেই দিবেন।

আল্লাহ তাআলা রোযাদারকে কেয়ামতের দিন পানি পান করাবেন

হযরত আবু মুসা রাহতে বর্ণিত,

ان الله تبارك وتعالى قضى على نفسه أنه من اعطش نفسه له في صائف سقاه يوم العطش،

رواه البزار، وذكره الهيثمي في المجمع (5095)، وقال : رواه البزار، ورجاله موثقون. وقال المنذري في الترغيب (1478)، : إسناده حسن، ان شاء الله.

আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজের উপর অবধারিত করে নিয়েছেনযে ব্যক্তি তার সন্তুষ্টির জণ্য গ্রীষ্মকালে (রোযার কারণেপিপাসার্ত থেকেছেতিনি তাকে তৃষ্ণার দিন (কিয়ামতের দিনপানি পান করাবেন।-মুসনাদে বাযযারহাদীস : ১০৩৯মাজমাউয যাওয়াইদহাদীস : ৫০৯৫

হযরত আবু হুরায়রা রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

قال الله تعالى : الصيام لى وانا اجزى به ... فان لهم يوم القيامة حوضا ما يرده غير الصائم،

رواه البزار وذكره الهيثمي في المجمع، (5093)، وقال : رواه البزار، ورجاله موثقون.

আল্লাহ তাআলা বলেনরোযা আমার জন্যআমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। কেয়ামতের দিন রোযাদারদের জন্য একটি বিশেষ পানির হাউজ থাকবেযেখানে রোযাদার ব্যতীত অন্য কারো আগমন ঘটবে না।-মুসনাদে বাযযারহাদীস : ৮১১৫;  মাজমাউয যাওয়াইদহাদীস : ৫০৯৩

রোযা হল জান্নাত লাভের পথ

عن حذيفة رضي الله عنه  قال : اسندت النبي صلى الله عليه وسلم إلى صدري، فقال : من قال : لا إله إلا الله ختم له بها دخل الجنة، ومن صام يوما ابتغاء وجه الله ختم له به، دخل الجنة، ومن تصدق بصدقة ختم له بها، دخل الجنة، رواه احمد، وذكره الهيثمى فى المجمع (11935) وقال : رواه احمد ورجاله رجال الصحيح غير عثمان بن مسلم البتى وهو ثقة، فالحديث صحيح كما قاله الشيخ احمد شاكر والشيخ شعيب الارنؤوط.

হযরত হুযায়ফা রাবলেনআমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার বুকের সাথে মিলিয়ে নিলামতারপর তিনি বললেনযে ব্যক্তি লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেযে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় একদিন রোযা রাখবেপরে তার মৃত্যু হয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো দান-সদকা করে তারপর তার মৃত্যু হয়সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ২৩৩২৪মুসনাদে বাযযারহা.২৮৫৪

عن أبي أمامة قال : أتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم، فقلت : مرني بعمل يدخلني الجنة، قال : عليك بالصوم، فانه لا عدل له، ثم أتيته الثانية، فقال لي : عليك بالصيام.

হযরত আবু উমামা রাহতে বর্ণিততিনি বলেনআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আগমন করে বললামইয়া রাসূলুল্লাহআমাকে এমন একটি আমল বলে দিনযার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। তিনি বলেনতুমি রোযা রাখকেননা এর সমতুল্য কিছু নেই। আমি পুনরায় তার নিকট এসে একই কথা বললাম। তিনি বললেনতুমি রোযা রাখ।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ২২১৪৯সহীহ ইবনে খুযাইমাহাদীস : ১৮৯৩সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৩৪২৬সুনানে নাসায়ীহাদীস : ২৫৩০

রোযাদারগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে ‘রাইয়ান’ নামক বিশেষ দরজা দিয়ে

হযরত সাহল ইবনে সা রাহতে বর্ণিতনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

إن فى الجنة بابا يقال له الريَّان يدخل منه الصائمون يوم القيامة، لا يدخل منه أحد غيرهم، يقال : اين الصائمون فيقومون، لا يدخل منه أحد غيرهم، فاذا دخلوا اغلق، فلم يدخل منه احد.

জান্নাতে একটি দরজা আছেযার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন  দরজা দিয়ে কেবল রোযাদার ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা করা হবেকোথায় সেই সৌভাগ্যবান রোযাদারগণতখন তারা উঠে দাড়াবে। তারা ব্যতীত কেউ  দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। অতঃপর রোযাদারগণ যখন প্রবেশ করবেতখন তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে কেউ  দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।-সহীহ বুখারীহাদীস : ১৮৯৬সহীহ মুসলিমহাদীস : ১১৫২মুসনাদে আহমদহাদীস : ২২৮১৮

হযরত সাহল ইবেন সা হতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

ان للصائمين بابا فى الجنة يقال له : الريان، لا يدخل منه غيرهم اذا دخل آخرهم اغلق، ومن دخل منه شرب، ومن شرب منه لم يظمأ ابدًا.

قال الترمذى : هذا حديث حسن صحيح غريب.

জান্নাতে রোযাদার ব্যক্তিদের জন্য একটি বিশেষ দরজা আছেযার নাম রাইয়ান। রোযাদারগণ ছাড়া অন্য কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। যখন সর্বশেষ রোযাদার ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবেতখন সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি  দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেসে (জান্নাতের পানীয়পান করবে। আর যে পান করবেসে কখনো পিপাসার্ত হবে না।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ২২৮৪২সহীহ ইবনে খুযায়মাহাদীস : ১৯০২সুনানে তিরমিযীহাদীস : ৭৬৫সুনানে নাসায়ীহাদীস : ২৫৪৪


শাবান-রমযান-১৪৩৩   ||   জুলাই-আগস্ট-২০১২

কুরআন মজীদ ও সহীহ হাদীসের আলোকে রোযার গুরুত্ব ও ফযীলত

মাওলানা মুহাম্মদ আনসারুল্লাহ হাসান

রমযনের রোযা ইসলামের পাঁচ স্তম্ভের অন্যতম। ঈমাননামায  যাকাতের পরই রোযার স্থান। রোযার আরবি শব্দ সওমযার আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। পরিভাষায় সওম বলা হয়-প্রত্যেক সজ্ঞানবালেগ মুসলমান নর-নারীর সুবহে সাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত রোযার নিয়তে পানাহারস্ত্রী সহবাস  রোযাভঙ্গকারী সকল কাজ থেকে বিরত থাকা। সুতরাং রমযান মাসের চাঁদ উদিত হলেই প্রত্যেক সুস্থমুকীম প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষ এবং হায়েয-নেফাসমুক্ত প্রাপ্তবয়স্কা নারীর উপর পূর্ণ রমযান রোযা রাখা ফরয।  সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آَمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

(তরজমাহে ঈমানদারগণতোমাদের উপর রোযা ফরয করা হয়েছেযেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপরযেন তোমরা মুত্তাকী হতে পার।-সূরা বাকারা () : ১৮৩

অন্য আয়াতে ইরশাদ করেছেন-

فَمَنْ شَهِدَ مِنْكُمُ الشَّهْرَ فَلْيَصُمْهُ

(তরজমাসুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তিই  মাস পাবেসে যেন অবশ্যই রোযা রাখে।সূরা বাকারা () : ১৮৫

হযরত আবু হুরায়রা রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

إذا رأيتم الهلال فصوموا وإذا رأيتموه فافطروا، فإن غم عليكم فصوموا ثلاثين،

وفي رواية : صوموا لرؤيته وأفطروا لرويته، فإن عم عليكم فاكملوا العدد.

যখন তোমরা (রমযানেরচাঁদ দেখবেতখন থেকে রোযা রাখবে আর যখন (শাওয়ালেরচাঁদ দেখবেতখন থেকে রোযা বন্ধ করবে। আকাশ যদি মেঘাচ্ছন্ন থাকে তবে ত্রিশ দিন রোযা রাখবে।-সহীহ বুখারীহাদীস : ১৯০৯সহীহ মুসলিমহাদীস : ১০৮০ (১৭-১৮)

উল্লেখিত আয়াত  হাদীস এবং  বিষয়ক অন্যান্য দলীলের আলোকে প্রমাণিত যেরমযান মাসের রোযা রাখা ফরযইসলামের আবশ্যক বিধানরূপে রোযা পালন করা  বিশ্বাস করাও ফরয।

তাছাড়া কোনো শরয়ী ওযর ছাড়া কোন মুসলমান যদি রমযান মাসের একটি রোযাও ইচ্ছাকৃতভাবে পরিত্যাগ করে তাহলে সে বড় পাপী  জঘন্য অপরাধীরূপে গণ্য হবে। দ্বীনের মৌলিক বিধান লঙ্ঘনকারী  ঈমান-ইসলামের ভিত্তি বিনষ্টকারী হিসেবে পরিগণিত হবে। হাদীস শরীফে ইচ্ছাকৃতভাবে রোযা ত্যাগকারী  ভঙ্গকারীর জন্য কঠিন শাস্তির কথা বর্ণিত হয়েছে।

হযরত আবু উমামা রাবলেনআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

بينما أنا نائم أتاني رجلان فأخذا بضبعي فأتيابي جبلا وعرا فقالا : اصعد؛ فقلت : إني لا أطيقه. فقالا: سنسهله لك، فصعدت حتى إذا كنت في سواء الجبل إذا بأصوات شديدة، قلت : ما هذه الأصوات؟ قالوا هذا عواء أهل النار، ثم انطلق بي، فإذا أنا بقوم معلقين بعراقيبهم، مشققة اشداقهم، تسيل اشداقهم دما. قال : قلت : من هؤلاء : قال : الذين يفطرون قبل تحلة صومهم.

رواه الحاكم فى المستدرك وقال : صحيح على شرط مسلم، ووافقه الذهبي، وذكره الهيثمى فى المجمع (240)، وقال : رجاله رجال الصحيح

আমি ঘুমিয়ে ছিলাম। স্বপ্নে দেখলাম আমার নিকট দুই ব্যক্তি আগমন করল। তারা আমার বাহুদ্বয় ধরে আমাকে এক দুর্গম পাহাড়ে নিয়ে এল। তারপর আমাকে বললআপনি পাহাড়ের উপর উঠুন। আমি বললামআমি তো উঠতে পারব না। তারা বললআমরা আপনাকে সহজ করে দিব। আমি উপরে উঠলাম। যখন পাহাড়ের সমতলে পৌঁছালামহঠাৎ ভয়ঙ্কর আওয়াজ শুনতে পেলাম। আমি বললাম সব কিসের আওয়াজতারা বললএটা জাহান্নামীদের আর্তনাদ। তারপর তারা আমাকে নিয়ে এগিয়ে চলল। হঠাৎ কিছু লোক দেখতে পেলামযাদেরকে তাদের পায়ের মাংসপেশী দ্বারা ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে। এবং তাদের মুখের দুই প্রান্ত ছিড়ে ফেলা হয়েছে এবং তা থেকে রক্ত ঝরছে। আমি বললামএরা কারাতারা বললযারা ইফতারের সময় হওয়ার আগেই রোযা ভেঙ্গে ফেলে।-সহীহ ইবনে খুযাইমাহাদীস : ১৯৮৬সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৭৪৪৮সুনানে নাসায়ী কুবরাহাদীস : ৩২৮৬মুসতাদরাকে হাকিমহাদীস-১৬০৯তবারানীহাদীস : ৭৬৬৬

রমযান মাসের একদিন রোযা না রাখলে মানুষ শুধু গুনাহগারই হয় না রোযার পরিবর্তে আজীবন রোযা রাখলেও রমযানের এক রোযার যে মর্যাদা  কল্যাণযে অনন্ত রহমত  খায়ের-বরকত তা কখনো লাভ করতে পারবে না এবং কোনোভাবেই এর যথার্থ ক্ষতিপূরণ আদায় হবে না।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাবলেন,

من افطر يوما من رمضان متعمدا من غير سفر ولا مرض لم يقضه ابدا، وان صام الدهر كله، ... وقد ذكره البخاري تعليقا بصيغة الجزم حيث قال : وبه قال ابن مسعود، وقال الشيخ محمد عوامه : وهذا الحديث موقوف لفظا ومرفوع حكما

যে ব্যক্তি অসুস্থতা  সফর ব্যতীত ইচ্ছাকৃতভাবে রমযানের একটি রোযাও ভঙ্গ করেসে আজীবন রোযা রাখলেও  রোযার হক আদায় হবে না।-মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৯৮৯৩মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাকহাদীস : ৭৪৭৬সহীহ বুখারী /১৬০

হযরত আলী রাবলেন-

من افطر يوما من رضمان متعمدا لم يقضه أبدا طول الدهر.

যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে রমযান মাসের একটি রোযা ভঙ্গ করবেসে আজীবন সেই রোযার (ক্ষতিপূরণআদায় করতে পারবে না।মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৯৮৭৮

হাদীস শরীফে বর্ণিত রোযার কিছু ফযীলত  বৈশিষ্ট্য এখানে উল্লেখ করা হলো :

রোযার প্রতিদান আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজেই দিবেন এবং বিনা হিসাবে দিবেন

প্রত্যেক নেক আমলের নির্ধারিত সওয়াব  প্রতিদান রয়েছেযার মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আমলকারীকে পুরস্কৃত করবেন। কিন্তু রোযার বিষয়টি সম্পূর্ণ আলাদা। কারণ রোযার বিষয়ে আছে আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে এক অনন্য ঘোষণা।

হযরত আবু হুরায়রা রাথেকে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

كل عمل ابن آدم يضاعف الحسنة بعشر أمثالها إلى سبعمائة ضعف، قال الله تعالى : الا الصوم فإنه لى وانا أجزى به يدع شهوته وطعامه من أجلى.

মানুষের প্রত্যেক আমলের প্রতিদান বৃদ্ধি করা হয়। একটি নেকীর সওয়াব দশ গুণ থেকে সাতাশ গুণ পর্যন্ত। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেনকিন্তু রোযা আলাদা। কেননা তা একমাত্র আমার জন্য এবং আমি নিজেই এর বিনিময় প্রদান করব। বান্দা একমাত্র আমার জন্য নিজের প্রবৃত্তিকে নিয়ন্ত্রণ করেছে এবং পানাহার পরিত্যাগ করেছে।-সহীহ মুসলিমহাদীস : ১১৫১ (১৬৪); মুসনাদে আহমদহাদীস : ৯৭১৪মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৮৯৮৭সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস : ১৬৩৮

অন্য বর্ণনায় আছে-

عن أبى هريرة رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه وسلم : قال الله : يترك طعامه وشرابه وشهوته من أجلى، الصيام لى وانا اجزى به، والحسنة بعشر امثالها.

হযরত আবু হুরায়রা রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেনআল্লাহ রাববুল আলামীন বলেনবান্দা একমাত্র আমার জন্য তার পানাহার  কামাচার বর্জন করেরোযা আমার জন্যইআমি নিজেই তার পুরস্কার দিব আর (অন্যান্যনেক আমলের বিনিময় হচ্ছে তার দশগুণ।-সহীহ বুখারীহাদীস : ১৮৯৪মুসনাদে আহমদহাদীস : ৯৯৯৯মুয়াত্তা মালেক /৩১০

রোযা বিষয়ে-অন্য বর্ণনায়-আললাহ তাআলা বলেন, ‘‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্যপক্ষান্তরে রোযা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। (সহীহ বুখারী হাদীস-১৯০৪)

 কথার তাৎপর্য হলযদিও প্রকৃতপক্ষে সকল ইবাদতই আল্লাহর জন্যতার সন্তুষ্টি  নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যেই হয়ে থাকে। তবুও রোযা  অন্যান্য ইবাদতের মধ্যে একটি বিশেষ পার্থক্য রয়েছে। তা হল-অন্যান্য সকল ইবাদতের কাঠামোগত ক্রিয়াকলাপআকার-আকৃতি  নিয়ম পদ্ধতি এমন যেতাতে আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ছাড়াও ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের সুযোগ বিদ্যমান থাকে। মুখে প্রকাশ না করলেও অনেক সময় তার অন্তরে রিয়া তথা লোক দেখানো ভাব সৃষ্টি হতে পারে। তার অনুভূতির অন্তরালে  ধরনের ভাব লুকিয়ে থাকে। তা সে অনুভব করতে না পারলেও তার ভিতরে অবচেতনভাবে বিদ্যমান থাকে। ফলে সেখানে নফসের প্রভাব এসে যায়। পক্ষান্তরে রোযা এমন এক পদ্ধতিগত ইবাদততার-আকার-আকৃতি এরূপ যেআল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্য ব্যতীত ইবাদতকারীর নফসের স্বাদ গ্রহণের বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই। রোযাদার ব্যক্তি নিজ মুখে রোযার বিষয়টি প্রকাশ না করলে সাধারণত তা আলেমুল গায়েব আল্লাহ তাআলা ব্যতীত কারো নিকট প্রকাশিত হওয়ার মত নয়। তাই রোযার ক্ষেত্রে মাওলার সন্তুষ্টির বিষয়টি একনিষ্ঠভাবে প্রতিভাত হয়। একারণেই রোযা  অন্যান্য ইবাদতের মাঝে এরূপ বিস্তর ব্যবধান।

রোযার এত বড় ফযীলতের কারণ এটাও হতে পারে যেরোযা ধৈর্য্যের ফলস্বরূপ। আর ধৈর্য্যধারণকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলার সুসংবাদ হল-

إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ

ধৈর্য্যধারণকারীগণই অগণিত সওয়াবের অধিকারী হবে।-সূরা যুমার (৩৯) : ১০

সব মাখলুকের স্রষ্টাবিশ্বজাহানের প্রতিপালকআল্লাহ তাআলা নিজেই যখন এর পুরস্কার দিবেনতখন কী পরিমাণ দিবেনইমাম আওযায়ী রাহ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেছেনআল্লাহ যে রোযাদারকে প্রতিদান দিবেনতা মাপা হবে নাওজন করা হবে না অর্থাৎ বিনা হিসাবেই দিবেন।

আল্লাহ তাআলা রোযাদারকে কেয়ামতের দিন পানি পান করাবেন

হযরত আবু মুসা রাহতে বর্ণিত,

ان الله تبارك وتعالى قضى على نفسه أنه من اعطش نفسه له في صائف سقاه يوم العطش،

رواه البزار، وذكره الهيثمي في المجمع (5095)، وقال : رواه البزار، ورجاله موثقون. وقال المنذري في الترغيب (1478)، : إسناده حسن، ان شاء الله.

আল্লাহ রাববুল আলামীন নিজের উপর অবধারিত করে নিয়েছেনযে ব্যক্তি তার সন্তুষ্টির জণ্য গ্রীষ্মকালে (রোযার কারণেপিপাসার্ত থেকেছেতিনি তাকে তৃষ্ণার দিন (কিয়ামতের দিনপানি পান করাবেন।-মুসনাদে বাযযারহাদীস : ১০৩৯মাজমাউয যাওয়াইদহাদীস : ৫০৯৫

হযরত আবু হুরায়রা রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

قال الله تعالى : الصيام لى وانا اجزى به ... فان لهم يوم القيامة حوضا ما يرده غير الصائم،

رواه البزار وذكره الهيثمي في المجمع، (5093)، وقال : رواه البزار، ورجاله موثقون.

আল্লাহ তাআলা বলেনরোযা আমার জন্যআমি নিজেই এর প্রতিদান দিব। কেয়ামতের দিন রোযাদারদের জন্য একটি বিশেষ পানির হাউজ থাকবেযেখানে রোযাদার ব্যতীত অন্য কারো আগমন ঘটবে না।-মুসনাদে বাযযারহাদীস : ৮১১৫;  মাজমাউয যাওয়াইদহাদীস : ৫০৯৩

রোযা হল জান্নাত লাভের পথ

عن حذيفة رضي الله عنه  قال : اسندت النبي صلى الله عليه وسلم إلى صدري، فقال : من قال : لا إله إلا الله ختم له بها دخل الجنة، ومن صام يوما ابتغاء وجه الله ختم له به، دخل الجنة، ومن تصدق بصدقة ختم له بها، دخل الجنة، رواه احمد، وذكره الهيثمى فى المجمع (11935) وقال : رواه احمد ورجاله رجال الصحيح غير عثمان بن مسلم البتى وهو ثقة، فالحديث صحيح كما قاله الشيخ احمد شاكر والشيخ شعيب الارنؤوط.

হযরত হুযায়ফা রাবলেনআমি আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আমার বুকের সাথে মিলিয়ে নিলামতারপর তিনি বললেনযে ব্যক্তি লাইলাহা ইল্লাল্লাহু’ বলে মৃত্যুবরণ করবে সে জান্নাতে প্রবেশ করবেযে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনায় একদিন রোযা রাখবেপরে তার মৃত্যু হয় সে জান্নাতে প্রবেশ করবে। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে কোনো দান-সদকা করে তারপর তার মৃত্যু হয়সে জান্নাতে প্রবেশ করবে।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ২৩৩২৪মুসনাদে বাযযারহা.২৮৫৪

عن أبي أمامة قال : أتيت رسول الله صلى الله عليه وسلم، فقلت : مرني بعمل يدخلني الجنة، قال : عليك بالصوم، فانه لا عدل له، ثم أتيته الثانية، فقال لي : عليك بالصيام.

হযরত আবু উমামা রাহতে বর্ণিততিনি বলেনআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দরবারে আগমন করে বললামইয়া রাসূলুল্লাহআমাকে এমন একটি আমল বলে দিনযার দ্বারা আমি জান্নাতে প্রবেশ করতে পারব। তিনি বলেনতুমি রোযা রাখকেননা এর সমতুল্য কিছু নেই। আমি পুনরায় তার নিকট এসে একই কথা বললাম। তিনি বললেনতুমি রোযা রাখ।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ২২১৪৯সহীহ ইবনে খুযাইমাহাদীস : ১৮৯৩সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৩৪২৬সুনানে নাসায়ীহাদীস : ২৫৩০

রোযাদারগণ জান্নাতে প্রবেশ করবে ‘রাইয়ান’ নামক বিশেষ দরজা দিয়ে

হযরত সাহল ইবনে সা রাহতে বর্ণিতনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

إن فى الجنة بابا يقال له الريَّان يدخل منه الصائمون يوم القيامة، لا يدخل منه أحد غيرهم، يقال : اين الصائمون فيقومون، لا يدخل منه أحد غيرهم، فاذا دخلوا اغلق، فلم يدخل منه احد.

জান্নাতে একটি দরজা আছেযার নাম রাইয়ান। কিয়ামতের দিন  দরজা দিয়ে কেবল রোযাদার ব্যক্তিরাই প্রবেশ করবে। অন্য কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। ঘোষণা করা হবেকোথায় সেই সৌভাগ্যবান রোযাদারগণতখন তারা উঠে দাড়াবে। তারা ব্যতীত কেউ  দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। অতঃপর রোযাদারগণ যখন প্রবেশ করবেতখন তা বন্ধ করে দেওয়া হবে। ফলে কেউ  দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না।-সহীহ বুখারীহাদীস : ১৮৯৬সহীহ মুসলিমহাদীস : ১১৫২মুসনাদে আহমদহাদীস : ২২৮১৮

হযরত সাহল ইবেন সা হতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

ان للصائمين بابا فى الجنة يقال له : الريان، لا يدخل منه غيرهم اذا دخل آخرهم اغلق، ومن دخل منه شرب، ومن شرب منه لم يظمأ ابدًا.

قال الترمذى : هذا حديث حسن صحيح غريب.

জান্নাতে রোযাদার ব্যক্তিদের জন্য একটি বিশেষ দরজা আছেযার নাম রাইয়ান। রোযাদারগণ ছাড়া অন্য কেউ এই দরজা দিয়ে প্রবেশ করতে পারবে না। যখন সর্বশেষ রোযাদার ব্যক্তি তাতে প্রবেশ করবেতখন সেই দরজা বন্ধ করে দেওয়া হবে। যে ব্যক্তি  দরজা দিয়ে প্রবেশ করবেসে (জান্নাতের পানীয়পান করবে। আর যে পান করবেসে কখনো পিপাসার্ত হবে না।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ২২৮৪২সহীহ ইবনে খুযায়মাহাদীস : ১৯০২সুনানে তিরমিযীহাদীস : ৭৬৫সুনানে নাসায়ীহাদীস : ২৫৪৪

হযরত আবু হুরায়রা রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

لكل اهل عمل باب من ابواب الجنة يدعون منه بذلك العمل، ولاهل الصيام باب يدعون منه، يقال له : الريان، فقال أبو بكر : يا رسول الله، هل احد يدعى من تلك الأبواب كلها؟ قال : نعم، وارجو أن تكون منهم يا ابا بكر،

প্রত্যেক প্রকারের নেক আমলকারীর জন্য জান্নাতে একটি করে বিশেষ দরজা থাকবেযার যে আমলের প্রতি অধিক অনুরাগ ছিল তাকে সে দরজা দিয়ে আহবান করা হবে। রোযাদারদের জন্যও একটি বিশেষ দরজা থাকবেযা দিয়ে তাদেরকে ডাকা হবেতার নাম হবে ‘রাইয়ান আবু বকর রাবললেনইয়া রাসূলুল্লাহএমন কেউ কি হবেনযাকে সকল দরজা থেকে আহবান করা হবেতিনি বলেনহ্যাঁআমি আশা রাখি তুমিও তাদের একজন হবে।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ৯৮০০মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবাহাদীস : ৩২৬২৮

 সম্পর্কে বুখারী-মুসলিমে বর্ণিত হয়েছেহযরত আবু হুরায়রা রাবলেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

من أنفق زوجين في سبيل الله نودي من أبواب الجنة : يا عبد الله هذا خير، فمن كان من أهل الصلاة دعي من باب الصلاة، ومن كان من أهل الجهاد دعي من باب الجهاد، ومن كان من أهل الصيام دعي من باب الريان، ومن كان من أهل الصدقة دعي من باب الصدقة، فقال أبو بكر : بأبي أنت وأمي، يا رسول الله! ما على من دعي من تلك الأبواب من ضرورة فهل يدعى أحد من تلك الأبواب كلها؟ قال : نعم، وأرجو أن تكون منهم.

 (সহীহ বুখারীহাদীস-১৮৯৬৩৬৬৬সহীহ মুসলিমহাদীস ১০২৭ (৮৫-৮৬); মুসনাদে আহমাদহাদীস-৭৬৩৩সহীহ ইবনে হিববানহাদীস -৩০৯)

রোযা জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢাল  দুর্গ

হযরত জাবির রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

قال ربنا عز وجل : الصيام جنة يستجن بها العبد من النار وهو لى وانا أجزى به.

وهذا حديث صحيح بطرقه وشواهده، قاله الشيخ شعيب الارنؤوط

আমাদের মহান রব ইরশাদ করেছেনরোযা হল ঢাল। বান্দা এর দ্বারা নিজেকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করবে। রোযা আমার জন্য আর আমিই এর পুরস্কার দিব।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ১৪৬৬৯শুয়াবুল ঈমান বাইহাকীহাদীস : ৩৫৭০

উসমান ইবনে আবিল আস রাবর্ণনা করেনআমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি,

الصيام جنة من النار كجنة احدكم من القتال،

রোযা হল জাহান্নাম থেকে রক্ষাকারী ঢালযুদ্ধক্ষেত্রে তোমাদের (শত্রুর আঘাত হতে রক্ষাকারীঢালের মত।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ১৬২৭৮সহীহ ইবনে খুযাইমাহাদীস : ২১২৫সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৩৬৪৯সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস : ১৬৩৯

হযরত আবু হুরায়রা রাহতে বর্ণিতনবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

الصيام جنة، وحصن حصين من النار

রোযা হল (জাহান্নাম থেকে পরিত্রান লাভেরঢাল এবং সুরক্ষিত দুর্গ।-মুসনাদে আহমদহাদীস-৯২২৫বাইহাকীশুয়াবুল ঈমানহাদীস-৩৫৭১

রোযা কিয়ামতের দিন সুপারিশ করবে

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

الصيام والقرآن يشفعان للعبد يوم القيامة، يقول الصيام : اى رب منعته الطعام والشهوة فشفعنى فيه، ويقول القرآن : منعته النوم بالليل، فشفعنى فيه، قال : فيشفعان له.

رواه أحمد، والحاكم فى المستدرك وقال : صحيح على شرط مسلم، ووافقه الذهبي، وذكره الهيثمي فى المجمع، وقال : رواه أحمد والطبرانى فى الكبير، ورجال الطبرانى رجال الصحيح.

রোযা  কুরআন কিয়ামতের দিন বান্দার জন্য সুপারিশ করবে। রোযা বলবেহে রবআমি তাকে খাদ্য  যৌন সম্ভোগ থেকে বিরত রেখেছি। অতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ গ্রহণ করুন। কুরআন বলবেআমি তাকে রাতের ঘুম থেকে বিরত রেখেছি, (অর্থাৎ না ঘুমিয়ে সে তেলাওয়াত করেছেঅতএব তার ব্যাপারে আমার সুপারিশ কবুল করুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঅতঃপর তাদের উভয়ের সুপারিশ গ্রহণ করা হবে।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ৬৬২৬মুসতাদরাকে হাকিমহাদীস : ২০৮০বাইহাকী শুয়াবুল ঈমানহাদীস : ১৯৯৪

রোযাদারের সকল গুনাহ মাফ হয়ে যায়

হযরত আবু হুরায়রা রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

من صام رمضان ايمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه،

যে ব্যক্তি ঈমানের সাথে সওয়াবের আশায় রমযান মাসের রোযা রাখবেতার পূর্ববর্তী গুনাহসমূহ ক্ষমা করে দেওয়া হবে।সহীহ বুখারীহাদীস : ৩৮২০১৪সহীহ মুসলিম ৭৬০(১৬৫); মুসনাদে আহমদহাদীস : ৭১৭০মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ৮৯৬৮