পৃষ্ঠাসমূহ

রবিবার, ১৮ জুন, ২০২৩

কুরআন ও হাদীসের আলোকে আশারায়ে যিলহজ্ব : গুরুত্ব, ফযীলত ও বিশেষ আমল

 আল্লা তাআলার বিধানানুসারে যে চারটি  মাস পবিত্র  সম্মানিততার একটি হল যিলহজ্ব মাস। আর  মাসের সবচেয়ে উৎকৃষ্ট  মর্যাদাপূর্ণ সময় হল আশারায়ে যিলহজ্ব বা যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশক। দুটি ইবাদত  দশকের মর্যাদাকে আরো অধিক বৈশিষ্ট্যমন্ডিত করেছে। কুরআন-হাদীসে এই দশকের বিশেষ ফযীলত  অসীম গুরুত্ব  তাৎপর্যের কথা বর্ণিত হয়েছে। স্বয়ং আল্লাহ তাআলা এই দশকের সম্মান  পবিত্রতা প্রকাশান্তে এই দশকের রজনীগুলোর নামে শপথ করেছেন।এরশাদ হয়েছে



والفجر، وليال عشر

শপথ ভোরবেলারশপথ দশ রাত্রির

-সূরা ফজর (৮৯) : -

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রা., হযরত আবদুল্লাহ ইবনে যুবাইর রা মুজাহিদ রাহসহ অধিকাংশ সাহাবীতাবেয়ী  মুফাসসিরের মতে এখানে দশ রাত্রির দ্বারা যিলহজ্ব মাসের প্রথম দশ রাতকেই বুঝানো 

হয়েছে। হাফেয ইবনে কাসীর রাহবলেনএটিই বিশুদ্ধ মত।-তাফসীরে ইবনে কাসীর /৫৩৫-৫৩৬

হাদীস শরীফে এই দশককে দুনিয়ার সবচেয়ে উত্তম   মর্যাদাবান দশক হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে।

হযরত জাবির রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

أفضل أيام الدنيا العشر، يعني عشر ذي الحجة، قيل ولا مثلهن في سبيل الله؟ قال : ولا مثلهن في سبيل الله، إلا رجل عُفِّر وجهه بالتراب.

দুনিয়ার সর্বোত্তম দিনগুলো হল যিলহজ্বের দশ দিন। জিজ্ঞাসা করা হলআল্লাহর  রাস্তায়ও কি তার সমতুল্য নেইতিনি বললেনআল্লাহর রাস্তায়ও তার সমতুল্য নেইতবে  ব্যক্তিযার চেহারা ধূলিযুক্ত হয়েছেঅর্থাৎ শাহদাতের মর্যাদা লাভ করেছে।-মুসনাদে বাযযারহাদীস : ১১২৮মুসনাদে আবু ইয়ালাহাদীস : ২০১০

অন্য বর্ণনায় হযরত জাবির রাহতে বর্ণিত হয়েছে 

ما من أيام أفضل عند الله من أيام عشر ذي الحجة ...

যিলহজ্বের দশ দিনের চেয়ে কোনো দিনই আল্লাহর নিকট উত্তম নয়।-সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ২৮৪২

এই দশকের নেক আমল আল্লাহর নিকট সবচেয়ে প্রিয়

কুরআন-হাদীসে আশারায়ে যিলহজ্বের উপরোক্ত বৈশিষ্ট্য  বিশেষ তাৎপর্যের কথা যেমন বর্ণিত হয়েছে তেমনি 

দশকের আমল  ইবাদত-বন্দেগীর বিশেষ ফযীলত  সওয়াবের কথাও অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বর্ণিত হয়েছে। এই দশকের নেক আমলবিশেষত আল্লাহর যিকির সম্পর্কে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ 

করেছেন

ويذكروا اسم الله في أيام معلومات على ما رزقهم من بهيمة الأنعام

 (তরজমানির্দিষ্ট দিনসমূহে তারা যেন আললাহর নাম উচ্চারণ করে সেই সকল পশুর উপরযা তিনি তাদের দিয়েছেন।-সূরা হজ্ব (২২) : ২৮

ইমাম বুখারী রাহবলেনহযরত ইবনে আববাস রা

বলেছেন, ‘‘সুনির্দিষ্ট দিনসমূহ’’ দ্বারা যিলহজ্বের দশ দিনই উদ্দেশ্য। অনুরূপভাবে হযরত ইবনে ওমর রা., হযান বসরী রাহ.,  আতা রাহ., মুজাহিদ রাহ., ইকরামা রাহ., কাতাদাহ রাহ., ইমাম নাখায়ী রাহ., ইমাম আবু হানীফাইমাম শাফেয়ীইমাম আহমদ রাহ.সহ অধিকাংশ উলামায়ে কেরামের অভিমতসুনির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা যিলহজ্বের দশ দিনই বোঝানো হয়েছে।-তাফসীরে ইবনে কাসীর /২৮৯লাতায়িফুল মাআরিফ ৩৬১

ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহবলেনআল্লাহকে স্মরণ  তার নাম উচ্চারণ শুধু যবেহ করার সময় নির্দিষ্ট নয়বরং সুনির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহর নাম উচ্চারণ অর্থ হলআল্লাহ তাআলা তার বান্দাদের যেসব নেয়ামতদান করেছেনবিশেষত 

জীব-জন্তুকে তাদের অধীন করে দিয়েছেনতাদের খাদ্য বানিয়েছেনইত্যাদি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা।-প্রাগুক্ত

এই দশকের দিন-রাতসমূহে নেক আমলের গুরুত্ব হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছে। হযরত ইবনে আববাস রাবর্ণনা করেনরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন

ما من أيام العمَلُ الصالح فيها أحب إلى الله عز وجل من هذه الأيام يعني أيام العشر، قالوا : يا رسول الله، ولا الجهاد في سبيل الله؟ قال : ولا الجهاد في سبيل الله، إلا رجل خرج بنفسه وماله، ثم لم يرجع من ذلك بشيء.

আল্লাহর নিকট যিলহজ্বের দশ দিনের নেক আমলের চেয়ে অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেনইয়া রাসূলুল্লাহআল্লাহর রাস্তায় জিহাদও (এর চেয়ে উত্তমনয়তিনি বললেননাআল্লাহর রাস্তায় জিহাদও নয়। তবে হ্যাঁসেই ব্যক্তির জিহাদ এর চেয়ে উত্তমযে নিজের জানমাল নিয়ে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের জন্য বের হয়েছেতারপর কোনো কিছুই নিয়ে ফিরে আসেনি।সুনানে আবু দাউদহাদীস : ২৪৩৮সহীহ বুখারীহাদীস : ৯৬৯সুনানে তিরমিযীহাদীস : ৭৫৭সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস : ১৭২৭মুসনাদে আহমদহাদীস : ১৯৬৮সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৩২৪

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

(অর্থআল্লাহ তাআলার নিকট আশারায়ে যিলহজ্বের আমলের চেয়ে অধিক মহৎ এবং অধিক প্রিয় অন্য কোনো দিনের আমল নেই। সুতরাং তোমরা সেই দিবসগুলোতে অধিক পরিমাণে তাসবীহ (সুবহানাল্লাহতাহমিদ (আলহামদুলিল্লাহতাহলীল (লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ তাকবীর (আল্লাহু আকবারপাঠ কর।-মুসনাদে আহমাদহাদীস : ৫৪৪৬মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবাহাদীস : ১৪১১০বায়হাকীশুয়াবুল ঈমানহাদীস : ৩৭৫০ত্ববারানীহাদীস : ১১১১৬মাজমাউয যাওয়াইদহাদীস : ৫৯৩২শরহু মুশকিলিল আছারহাদীস : ২৯৭১ 

কুরআনের উপরোক্ত আয়াত  হাদীসসমূহের আলোকে স্পষ্ট বুঝা যায়এই দশ দিনের যে কোনো নেক আমল আল্লাহর নিকট অধিক প্রিয়। তাই মুমিন বান্দার জন্য অধিক পরিমাণে সওয়াব অর্জনআল্লাহর নৈকট্য লাভ এবং আখেরাতের পাথেয় সংগ্রহের এরচেয়ে উপযুক্ত সময় আর কী হতে পারেএজন্য পূর্ববর্তীদের জীবনীতে এই দশকের আমল সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যেযখন এই দশকের দিনগুলোর আগমন ঘটত এত অধিক আমল  মুজাহাদা করতেনযা পরিমাপ করাও সম্ভব নয়। আমাদেরও উচিত বিভিন্ন নেক আমলের মাধ্যমে এই দশকের রাত-দিনগুলোকে জীবন্ত  প্রাণবন্ত করে তোলা।

আশারায়ে যিলহজ্বের বিশেষ আমল

এই দশক যেহেতু নেক আমলের বিশেষ সময় তাই এই দশ দিনের যেকোনো আমল যেমন আল্লাহর নিকট প্রিয়  পছন্দনীয় অধিক পরিমাণে নফল নামায আদায় করারোযা রাখাযিকির-আযকারকুরআন তিলাওয়াততাসবীহ-তাহলীল ইত্যাদি। তাই আল্লাহর নেয়ামত  বিশেষ অনুগ্রহ মনে করে এই দশকে সাধ্যমতো নেক আমলের পাবন্দী করা একান্ত প্রয়োজন। তাছাড়া বিভিন্ন হাদীসে এই দশকের বিশেষ কিছু আমলের কথাও বর্ণিত হয়েছে। যেমন-

চুলনখমোচ ইত্যাদি না কাটা

যিলহজ্বের চাঁদ দেখার পর থেকে কুরবানীর আগ পর্যন্ত নিজের নখচুলমোচনাভীর নিচের পশম ইত্যাদি না কাটা। এটা মুস্তাহাব আমল।

হযরত উম্মে সালামা রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

إذا رأيتم هلال ذي الحجة وأراد أحدكم أن يضحي فليمسك عن شعره وأظفاره.

তোমরা যদি যিলহজ্ব মাসের চাঁদ দেখতে পাও আর তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করে তবে সে যেন স্বীয় চুল  নখ কাটা থেকে বিরত থাকে।-সহীহ মুসলিমহাদীস : ১৯৭৭জামে তিরমিযীহাদীস : ১৫২৩সুনানে আবু দাউদহাদীস : ২৭৯১সুনানে নাসায়ীহাদীস : ৪৩৬২সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৫৮৯৭

যে ব্যক্তি কুরবানী করতে সক্ষম নয় সেও  আমল পালন করবে। অর্থাৎ নিজের চুলনখগোঁফ ইত্যাদি কাটবে নাবরং তা কুরবানীর দিন কাটবে। হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আমর রাহতে বর্ণিতরাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন-

أمرت بيوم الأضحى جعله الله عيدا لهذه الأمة. قال له رجل :يا رسول الله! أرأيت إن لم أجد إلا منيحة أنثى أفأضحي بها؟ قال : لا، ولكن خذ من شعرك وأظفارك وتقص شاربك وتحلق عانتك، فذلك تمام أضحيتك.

আমি কুরবানীর দিন সম্পর্কে আদিষ্ট হয়েছি (অর্থাৎ  দিবসে কুরবানী করার আদেশ করা হয়েছে।আল্লাহ তাআলা তা  উম্মতের জন্য ঈদ হিসাবে নির্ধারণ করেছেন। এক ব্যক্তি আরজ করলইয়া রাসূলাল্লাহযদি আমার কাছে শুধু একটি মানীহা থাকে অর্থাৎ যা শুধু দুধপানের জন্য দেওয়া হয়েছেআল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেননাবরং সেদিন তুমি তোমার চুল কাটবে (মুন্ডাবে বা ছোট করবে), নখ কাটবেমোচ এবং নাভীর নিচের পশম পরিষ্কার করবে। এটাই আল্লাহর কাছে তোমার পূর্ণ কুরবানী বলে গণ্য হবে।-মুসনাদে আহমদহাদীস : ৬৫৭৫সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৭৭৩সুনানে আবু দাউদহাদীস : ২৭৮৯সুনানে নাসায়ীহাদীস : ৪৩৬৫

অর্থাৎ যারা কুরবানী করতে সক্ষম নয় তারাও যেন মুসলমানদের সাথে ঈদের আনন্দ  খুশি উদযাপনে অংশীদার হয়। তারা এগুলো কর্তন করেও পরিপূর্ণ সওয়াবের অধিকারী হবে। অনুরূপভাবে হাজীদের সাদৃশ্য অবলম্বনকারী হবে।

ঈদের দিন ছাড়া বাকি নয় দিন রোযা রাখা

আশারায়ে যিলহজ্বের আরেকটি বিশেষ আমল হলঈদুল আযহার দিন ছাড়া প্রথম নয় দিন রোযা রাখা। হাদীস শরীফে বর্ণিত হয়েছেনবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই নয়টি দিবসে (যিলহজ্ব মাসের প্রথম নয় দিনরোযা রাখতেন।-সুনানে আবু দাউদহাদীস : ২৪৩৭মুসনাদে আহমাদহাদীস : ২২২৩৪সুনানে নাসায়ীহাদীস : ২৪১৬

অন্য হাদীসে হযরত হাফসা রাবর্ণনা করেন-

أربع لم يكن يدعهن النبي صلى الله عليه وسلم : صيام عاشوراء والعشر وثلاثة أيام من كل شهر وركعتين قبل الغداة.

চারটি আমল নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো ছাড়তেন না। আশুরার রোযাযিলহজ্বের প্রথম  দশকের রোযাপ্রত্যেক মাসের তিন দিনের রোযাফজরের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামায।-সুনানে নাসায়ীহাদীস :২৪১৫সহীহ ইবনে হিববানহাদীস : ৬৪২২মুসনাদে আবু ইয়ালাহাদীস : ৭০৪২মুসনাদে আহমাদহাদীস : ২৬৩৩৯

বিশেষভাবে নয় তারিখের রোযা রাখা

যিলহজ্বের প্রথম নয় দিনের মধ্যে নবম তারিখের রোযা সর্বাধিক ফযীলতপূর্ণ। সহীহ হাদীসে এই দিবসের রোযার ফযীলত বর্ণিত হয়েছে।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

صيام يوم عرفة أحتسب على الله أن يكفر السنة التي بعده والسنة التي قبله.

আরাফার দিনের (নয় তারিখেররোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর নিকট আশাবাদী যেতিনি এর দ্বারা বিগত এক বছর  আগামী বছরের গুনাহ মিটিয়ে দিবেন।-সহীহ মুসলিমহাদীস : ১১৬২সুনানে আবু দাউদহাদীস : ২৪২৫জামে তিরমিযীহাদীস : ৭৪৯সুনানে ইবনে মাজাহহাদীস : ১৭৩০

আরেক হাদীসে এসেছে-

من صام يوم عرفة غفر له سنتين متتابعتين.

যে ব্যক্তি আরাফার দিন রোযা রাখবে তার লাগাতার দুই বছরের (গুনাহ ক্ষমা করা হবে।-মুসনাদে আবু ইয়ালাহাদীস : ৭৫৪৮মাজমাউয যাওয়াইদহাদীস : ৫১৪১

যারা যিলহজ্বের নয় রোযা রাখতে সক্ষম হবে না তারা যেন অন্তত এই দিনের রোযা রাখা থেকে বঞ্চিত না হয়। আল্লাহ তাআলা আশারায়ে যিলহজ্বের মতো অন্যান্য বিশেষ বৈশিষ্ট্যমন্ডিত দিনগুলোতে ইবাদত-বন্দেগী করার তাওফীক দিন। আমীন।